কেন কঠোরতা ও প্রতিরোধ স্বল্পই কার্যকর
স্যার্শ পালাজি

জোলিংগেন এর কথিত ইসলামপন্হী হামলায় তিন জন নিহত এবং অনেকে আহত হওয়ার ঘটনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের গণতন্ত্র কতটা নড়বড়ে। এটা স্পষ্ট যে জার্মানিতে কারো থাকার অনুমতি না মিললে সেই ব্যক্তি যদি জনজীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এমন তথ্য থেকে থাকে তাহলে রাষ্ট্রের উচিত সেটা মোকাবিলার জন্য সব ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া। এটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের বেলাতেও খাটে।
আর এখানেই এই প্রবন্ধ আলাদা পথে হেঁটেছে, যেখানে চলমান আলাপ আলোচনা মোড় নিয়েছে একটা ঘৃণ্য ঘটনাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য। আর এক্ষেত্রে কিছু মানুষের “প্রাণহানী”কে গ্রহণ করে নেওয়া হচ্ছে।
নিহতদের শ্রেণি বিভাজন
আর এখন যারা ইইউর অভিবাসন নীতি আরও কড়াকড়ি করার চেষ্টা করবে তারা আসলে জেনে অথবা না জেনে এর শিকার যারা হবে তাদের শ্রেণি বিভাজন করছে। যখন কোন মানুষের আশ্রয় চাওয়ার আবেদন নাকচ করা হয় অথবা তাকে এমন কোন দেশে ফেরত পাঠানো হয় যেখানে তার জানমালের ঝুঁকি আছে তখন যারা এই ধরণের নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে তারাও এর দায় এড়াতে পারবে না। সংক্ষেপে: যখন মানুষ তার ধর্ম, রাজনৈতিক অথবা যৌন আচার আচরণের কারণে রাজনৈতিক আশ্রয় চায় এবং তা নাকচ হয় কেবল এজন্য যে তার দেশ থেকে কোন একজন আততায়ীর উদ্ভব ঘটেছে তখন তা জেনেভা কনভেনশনের বরখেলাপ। এই কাজ করে হামলার ঘটনাকে মুছে দেওয়া যাবে না বরং তাকে নিয়ে রাজনৈতিক খেলায় নিজেকে জাহির করা যাবে। এতে হয়তো জনগণের একটা অংশ নিজেকে আরও বেশি নিরাপদ মনে করতে পারে। কিন্তু তাতে দেশের নিরাপত্তা আরও ভালো হবে কিনা সে প্রশ্ন থেকে যাবে।
সামাজিক বিভক্তি
যে রাজনীতি “আমরা” আর “ওরা” বলে বিভক্তি তৈরি করছে তা জার্মানিকে আবারও সেই নৃতাত্ত্বিক পুনর্জাতীয়তাবাদের দিকে ঠেলে দিবে। এতে লাভ হবে শুধু উগ্রপন্থী রাজনীতিকদের যারা ইতিমধ্যে জোর কদমে এগিয়ে যাচ্ছে। আর যারা শুধু ভোট পাওয়ার আশায় এতে লাফ দিয়ে উঠে পড়ছেন তারাও এসব উগ্রপন্থীদের সাহায্য করছেন। এই ধরণের রাজনীতি শুধু সমাজকে ভেতর থেকে বিভক্ত করে যাবে। এর যে সামাজিক এবং আর্থিক মূল্য আমাদের দিতে হবে তার সামর্থ্য আমাদের নেই। গত কয়েক দশক ধরে একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক জার্মানি গড়ার যে কাজ হয়েছে তা বিপদের মধ্যে পড়ে যাবে। আর যারা কয়েক দশক ধরে জার্মানির সাফল্যে অবদান রেখে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণাচর্চা আরও বাড়বে। যে দেশের মাটিতে নিজ জনগণের কর্মদক্ষতা ও প্রতিভার বাইরে অন্য কোন ধরণের সম্পদ নেই, সেখানে এইরকম বিতর্কিত কথাবার্তার মাধ্যমে জনগণের বড় অংশটিকে বিচ্ছিন্ন করাটা কোন কাজের নয়।
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা হুমকির মুখে
এই যে মানুষের মধ্যে এক গ্রুপ “আমরা” বলে বাকিদেরকে আলাদা করার চেষ্টা করছে এটা সমাজের শুধু অন্তর্গত নয় বরং অপরাপর সমাজের সঙ্গে সহবাসকেও অসম্ভব করে তুলছে। পরের বিষয়টি আবার বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পূর্বশর্ত যা “পুনর্জাতীয়তাবাদ” দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো যেমন মানব সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ ও মহামারী আমরা কেবল একসঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবো। যেসব রাজনীতিরা নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চান- সঠিকভাবে বললে: বৈশ্বিক সমস্যাগুলো থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে রাখতে চান, যার অন্যতম কারিগর আসলে “বৈশ্বিক উত্তর”- এবং এর মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে চান তারা কেবল খুব সামান্য সময়ের জন্যই তা করতে পারবেন। সম্পদ, প্রযুক্তি কিংবা উপকরণের কোন ঐতিহাসিক সঞ্চয় নিশ্চিত করতে পারবে না যে উপর্যুক্ত চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের ঘাড়ে এসে পড়বে না।
যা দরকার
এই ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন অংশ বিশেষ করে যেসব রাজনীতিকগণ এই জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে সরল সমাধানের পথে পা বাড়াননি তাদের একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য। তারা অভিবাসন নীতির অবসান চাওয়ার ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে বরং এমন একটি বিশ্ব গড়ার কথা চিন্তা করছেন যেখানে মানুষের দেশ ছাড়ার প্রয়োজন এমনিতেই হবে না। তারা বিভক্তির দিকে না গিয়ে বরং সমাজের সকলকে সহায়তার কথা বলছেন, কারণ তারা বুঝতে পেরেছেন যে এটা শুধু নৈতিক দিক থেকেই নয় বরং সামগ্রিক সমাজের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়। তারা শুধু এই মুহুর্তে অপরিহার্য এবং টেকসই একটি বৈশ্বিক ডায়ালগের কথা বলছেন না, তারা সেটা কাজেও করিয়ে দেখাচ্ছেন। এটার প্রয়োজন আছে।