
স্যার্জ পালাজি
জাতীয়তাবাদ কীভাবে আগামীর জন্য হুমকি এবং এর বিরুদ্ধে করণীয়
ক্রমবর্ধমান নির্লজ্জতার সাথে, রাজনৈতিক নেতা এবং জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে এমন ব্যক্তিরা মনে করে যাচ্ছেন: একটি জাতি যত বেশি সমজাতীয় হবে, ততই ভালো। এইভাবে, বিভিন্ন দেশের মানুষকে (এমনকি আমাদের জার্মানিতেও) অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। যাদের ভিন্ন পটভূমি এবং একটি দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক ইতিহাস রয়েছে, তারা যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই সত্যটি প্রায়শই কোনো ভূমিকা রাখে না। তাদের ভিন্নতাকে প্রায়শই অস্বীকার করা হয়। তাদের একটি একক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, এবং কিছু ব্যতিক্রম বাদে তাদেরকে কমতি হিসেবে দেখা হয়। গণহারে তাদের ওপর কিছু অপরাধীর ব্যক্তিগত কৃতকর্মের দায় চাপানো হয়। জার্মানির অগ্রগতিতে তাদের ঐতিহাসিক এবং বর্তমান অবদানকে খুব কমই সম্মান দেখানো হয়।
জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বরের সাফল্যের কারণ
কিন্তু জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বর দিয়ে রাজনীতি পরিচালনা করা কেন দিন দিন সম্ভব হচ্ছে? একটি কারণ হলো, পরিবর্তিত বৈশ্বিক কাঠামো। আমরা “পশ্চিমে” ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছি। বিশ্বজুড়ে যত বেশি নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে, ‘আমাদের জীবনধারার’ অর্থনৈতিক দিকটি ততই হুমকির মুখে পড়ছে। এর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া যে ভয় এবং অনিশ্চয়তা, এটা বোধগম্য।
তাছাড়া, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতিগুলো ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। মহামারী ছড়িয়ে পড়ছে এবং সশস্ত্র সংঘাত বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন যে এই চ্যালেঞ্জগুলোর বিরুদ্ধে ‘কিছুই করার নেই’ অথচ সেগুলোকে এখন প্রায়ই ‘বহু-সংকট’ (polycrisis) হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে। এর সম্ভাব্য পরিণতি হলো উদাসীনতা, বিচ্ছিন্নতা এবং ক্রমবর্ধমান স্বার্থপরতা অনেকটা যেন এমন মনোভাব “এসময়ে যার যার তার নিজের কথাই ভাবতে হবে।” কেন এই রকমের প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে সেটাও অবশ্য বোধগম্য।
তবে, যা নিন্দনীয় তা হলো, দিন দিন রাজনীতিবিদরা (অবশ্য শুধু জার্মানিতে নয়) উপরোক্ত ঘটনাপ্রবাহ এবং চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। নাগরিকদের উদ্বেগ ও ভয় দূর করার পরিবর্তে, তারা উল্টো সেগুলোকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। এর একটি কারণ হলো, উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান করা জটিল এবং তা রাতারাতি করা সম্ভব না। তা সত্ত্বেও, এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সততার সঙ্গে মোকাবিলা সম্ভব—যদিও তা মূল্যহীন নয়। দুর্ভাগ্যবশত, তা করার রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।
স্বার্থবাদী রাজনীতি গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ণ করে
ডানপন্থী দলগুলোর উত্থানপূর্ব রাজনীতিকে রোমান্টিক না করেও বলা যায়, রাজনীতিতে যেভাবে নৃতাত্ত্বিক-জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বর চলছে তা একটি জাতিগত স্বার্থবাদী রাজনীতির পক্ষেই যাচ্ছে। গণতন্ত্র শব্দটির মূল অর্থ বলতে যা বোঝায় সেটাকে তা ক্রমশই উপেক্ষা করে। যখন গণতন্ত্রে রাজনীতি জনতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে ক্রমেই উপেক্ষা করে পরিচালিত হয়, তখন শেষ পর্যন্ত এর পরিণতি “অমুক তমুক জাতিকে মহান করে তোলার” সস্তা স্লোগানের বদলে “নগদ যা পাও হাত পেতে নাও” এর নীতিতে দাঁড়ায়, আর এই ধরণের নীতি থেকে ক্ষুদ্র স্বার্থবাদী গোষ্ঠীগুলোই লাভবান হয়।
উপরোক্ত সমস্যাযুক্ত রাজনীতি যত বেশি চলতে থাকবে, আমরা সেই সমস্যাগুলোর প্রকৃত সমাধান করতে তত বেশি দেরি করব, যা কেবল বৈশ্বিক পর্যায়ে সমাধান করা সম্ভব।
তথাকথিত আসল পরিচয়ের বৈশ্বিক মাত্রা
নৃতাত্ত্বিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে জাতিগত পরিচয়ের যে বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে তা সারা বিশ্বে এক ধরণের বিশেষ সংহতি গড়ে তুলছে। শরণার্থী ও অভিবাসীসহ বিশেষ করে তথাকথিত “গ্লোবাল সাউথ” দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সময় থেকে চলে আসা বিশ্বব্যাপী শ্রমের অন্যায্য বিভাজন এবং তার সঙ্গে সম্পৃক্ত জলবায়ুগত অবিচারের কারণেই যে ব্যাপক অভিবাসনের চাপ তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়টি পুরোপুরি চেপে যাওয়া হচ্ছে।
দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়
একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্বই পারে যত বেশি সম্ভব মানুষের জন্য একটি অধিকতর বাসযোগ্য ভবিষ্যতের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তা দিতে।
যতক্ষণ পর্যন্ত কিছু গোষ্ঠীর বস্তুগত ও অবস্তুগত সুবিধাগুলো অন্য গোষ্ঠীর ক্ষতির বিনিময়ে অর্জিত হবে, তা সে নিজেদের সমাজেই হোক বা অন্য সমাজেই হোক, দীর্ঘমেয়াদে কেউই নিরাপদ বোধ করতে পারবে না। প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর দুর্বলতাই শেষ পর্যন্ত তাদের সহনশীলতার সীমা নির্ধারণ করে, যারা জাতিগতভাবে বা অন্য কোনোভাবে সংজ্ঞায়িত একটি স্বতন্ত্র “আমরা” গোষ্ঠীর মধ্যে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। আমাদের এমন ধারণার প্রয়োজন যা একটি ভালো জীবনের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করবে এবং সমৃদ্ধির পরিমাপ হিসেবে নিছক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর অন্ধ বিশ্বাস থেকে সরে আসবে। কেবল তখনই দেশীয় সীমানা পার হয়ে প্রকৃত সংহতির একটি সুযোগ তৈরি হবে।