বাংলাদেশে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে সংঘটিত হাজার হাজার গুমের ঘটনায় গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিশন। সেই কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব ঘটনা। শত শত মানুষকে বিনা বিচারে দিনের পর দিন আটকে রাখা, তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন শেষে হত্যা করার মত লোমহর্ষক বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে সাক্ষীদের জবানবন্দিতে। তদন্ত কমিশনের অন্যতম সদস্য নুর খান বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত মানবাধিকার কর্মী। তার সঙ্গে কথোপকথনে জানা যায় কী ভয়ঙ্কর ছিল হাসিনা আমলের গুমের রাজনীতি।
অনেক অভিযোগ এখনও বাকি
বাংলাদেশে গুমের ঘটনা স্বাধীনতার পর থেকেই ঘটে আসছে। কিন্তু ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এটি অস্বাভাবিক হারে সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করেন নুর খান। তিনি বলেন, “তদন্ত কমিশনের কাছে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮০০ অভিযোগ এসেছে। কিন্তু অভিযোগ করেননি এমন লোকের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি। যেমন গুমের শিকার কেউ আমাদের বলছেন তিনি বন্দী অবস্থায় আশেপাশে আরও কয়েকজনকে দেখেছেন। ওইসব লোকগুলোর কাছ থেকে কিন্তু আমরা কোন অভিযোগ পাইনি। ফলে আসল ঘটনার সংখ্যা অভিযোগের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।” এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তদন্ত করতে গিয়ে আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা জড়িত। অনেক ঘটনা ঘটেছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশে, অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী নিজের উদ্যোগেও এসব ঘটিয়েছে। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্য ভাড়াটিয়া ঘাতক হিসেবে কাজ করেছে। গুমের সংস্কৃতি এমন অবস্থাতে চলে গিয়েছিল যে বাহিনীর ভেতরকার পুরো স্ট্রাকচারটাই ধ্বংস হয়ে গেছে।”
হাফেজ জাকিরের ঘটনা
এসব অপরাধে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সম্পৃক্ত ম্পৃ থাকলেও তাদের মধ্যে অনেকে বাধ্য হয়ে অংশ নিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে তদন্ত কমিশনের কাছে জবানবন্দীতে এ ধরণের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। এমন একটা গুমের ঘটনা বলতে গিয়ে চলে আসে হাফেজ জাকির এর কথা। ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি মেস থেকে ছাত্র শিবিরের নেতা জাকিরকে গুম করা হয়। অপহরণের সময় সাধারণত গুমের শিকার ব্যক্তির মাথা ঢেকে ফেলা হয় আর চোখ বেধে ফেলা হয়। নুর খান বলেন, “হাফেজ জাকিরকে গুমের সময় জড়িত এক সদস্য পরে আমাদের কাছে স্বীকারোক্তি দেন। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন কমিশন্ড অফিসার। জাকিরকে অপহরণ করা হয় শেষ রাতের দিকে। ফজরের সময় সে বলে, আমি হাফেজ আমাকে একটু নামাজ পড়তে দেন। জাকিরের এই কথা ওই অফিসারকে খুবই নাড়া দেয়। কিছুদিন পর আটক জাকিরকে তার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন গভীর রাতে জাকিরের হাতকড়া এবং অন্যান্য জিনিষগুলো ওই অফিসারকে ফেরত দেওয়া হয়। তার অর্থছিলো জাকিরকে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত জাকিরকে ফেরত পাওয়া যায়নি। জুলা জু ইয়ের গণঅভ্যু ত্থানের পর সেই অফিসার আমাদের কাছে স্বীকারোক্তি দেন এবং তদন্তকাজে নানাভাবে সহায়তা করেন। গুমের সঙ্গে জড়িত সেই সেনা অফিসারকে নিয়ে আমরা পরবর্তীতে জাকিরের বাসস্থান চিহ্নিত করতে পারি।”
নির্মম নির্যাতন

যারা এই গুম থেকে ফিরে এসেছে তাদের কাছ থেকে মর্মন্তুদ বিবরণ পাওয়া গেছে। এই বন্দিশালাগুলোতে পুরুষ নারী সকলের ওপর চালানো হতো ভয়াবহ নির্যাতন। নারী পুরুষ সকলকেই জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করা হতো। নুর খান জানান, বন্দীশালাতে বন্দিদেরকে ঝুলিয়ে রাখা হতো, তাদের নখ উপড়ে ফেলা হতো। কাউকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে বিদ্যু তের শক দেওয়া হতো। কারও ওপর চলতো ওয়াটার বোর্ডিং এর মত কুখ্যাত নির্যাতন। অনেক পুরুষকে নগ্ন করে নারীদের সামনে হেনস্তা করা হতো। অনেককে বিদ্যু তের শক দেওয়া হতো। কাউকে বলা হতো পানি ভর্তিপাত্রের মধ্যে পেশাব করতে যেটা বিদ্যু তায়িত ছিল। পেশাব করার সঙ্গে সঙ্গে তার শক লাগতো। অনেক বন্দী এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল। এমন লোককেও পরবর্তীতে চিহ্নিত করতে পেরেছে তদন্ত কমিশন।
কীভাবে মারা হত বন্দিদের
বন্দিদেরকে নিয়ে কীভাবে মেরে ফেলা হতো তার বর্ণনা দিতে গিয়ে নুর খান জানান, যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সিভিল ড্রেস পরেই এই কাজগুলো করতো। শুরুতে তারা কাউকে গুম করে আটকে রাখতো। জিজ্ঞাসাবাদের পর যদি তারা কাউকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতো তখন গুমের শিকারকে মাইক্রোবাসে করে ঢাকার বাইরের টঙ্গী ব্রিজ কিংবা ভৈরব বাজারের দিকে নিয়ে যেতো। সেখানে ব্রিজের নিচে গুলি করে নদীতে ফেলে দিতো। অনেককে চলন্ত ট্রেন কিংবা বাসের সামনে ফেলে দিতো, যাতে মনে হতো এটা কোন দুর্ঘটনা। নুর খান আরও জানান, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত ছিলেন তাদের জবানবন্দী থেকে জানা গেছে ঢাকার বাইরে ফতুল্লা, খুলনা আর বরিশালের বিভিন্ন জায়গাতে নৌকাতে করে বন্দিদেরকে নিয়ে যাওয়া হতো, তারপর তাদেরকে হত্যা করে লাশ সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। নুর খান বলেন, “আমি এখন এসেছি মুন্সিগঞ্জে যেখানে ২০১১ সালের সময় অনেক বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া গিয়েছিলো। এসব লাশের সুরতহালে সবার কপালে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাদের হাত পা বাঁধা ছিল, কারও লাশ বাঁধা ছিল সিমেন্টের বস্তার সঙ্গে।”
আন্তর্জাতিক সহায়তা দরকার
বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এরকম হাজার হাজার গুম, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে কমিশনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে অনেক পুরনো ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে লাশের ময়না তদন্ত করতে হচ্ছে। নুর খান বলেন, “এত পুরনো লাশের ফরেন্সিক সুরতহাল একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এটা করার জন্য যে ধরণের কারিগরী বিষয় দরকার সেগুলো আমাদের নেই। এজন্য আমাদের দরকার আন্তর্জাতিক সহায়তা।”
সরকারের ভূমিকা
এই তদন্ত কাজে সরকারের পক্ষ থেকে কেমন সহায়তা পাচ্ছেন, এই প্রশ্নের জবাবে নুর খান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে আমরা আশানুরুপ সহযোগিতা পেয়েছি। ডিজিএফআই থেকে আমরা সহযোগিতা পেলেও সেটা আশানুরুপ নয়। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে এই সব অপরাধে যারা জড়িত ছিল তাদের অনেকে এখনও বিভিন্ন বাহিনীতে কর্মরত আছে। সুতরাং তাদের কাছ থেকে পুরোপুরি সহযোগিতা পাবো সেটাও আসলে আশা করা যায় না।” ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার আসলে যে এই বিচার এগিয়ে যাবে সেটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন মানবাধিকার কর্মী নুর খান। তার মতে, সবগুলো ঘটনার বিচার না হলেও অন্তত কিছু লোকের বিচার করে যাওয়া উচিত। আর যদি সরকার কিছু করতে নাও পারে, তাহলে সেটা আইসিসির কাছে যাবে। তিনি বলেন, “আগামীতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন এই বিচারে নমনীয়তা দেখাতে পারবে না। নাহলে বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকেও ঘাতক হিসেবে বিবেচনা করবে।”